
ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পথে এগোলে সিঙ্গাপুরে উৎপাদিত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য দেশের ভূগর্ভের গভীরে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দেশটির সরকারি সংস্থা এবং সুইডেনভিত্তিক একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে এমন কোনো মৌলিক প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা শনাক্ত হয়নি যা এই ধরনের সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে অসম্ভব করে তুলতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গবেষণাটি বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি ডেস্কটপ সমীক্ষা। সিঙ্গাপুরের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, জরিপ এবং আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন হবে।
২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের জ্বালানি বাজার কর্তৃপক্ষ (ইএমএ) এবং জাতীয় পরিবেশ সংস্থা (এনইএ) সুইডেনের পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান এসকেবি ইন্টারন্যাশনালকে দায়িত্ব দেয়। তাদের কাজ ছিল ছোট আয়তন ও উচ্চ জনঘনত্বের দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য উপায়, সীমাবদ্ধতা এবং ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করা।
যদিও গবেষণার কাজ ২০২৩ সালেই শেষ হয়, প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় ২০২৬ সালের মে মাসে। একই সময়ে সিঙ্গাপুর সরকার জানায়, ২০২৭ সালে দেশটি জাতিসংঘের অধীন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নের মুখোমুখি হবে। ওই মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দেশটি কতটা প্রস্তুত।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এসব বর্জ্যে এমন সব তেজস্ক্রিয় উপাদান থাকে, যেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব হাজার হাজার বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা না করা হলে তা মানবস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সাধারণত তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এবং ক্ষয়প্রক্রিয়ার সময় অনুযায়ী পারমাণবিক বর্জ্যকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। নিম্নমাত্রার বর্জ্যের মধ্যে ব্যবহৃত গ্লাভস, পোশাক ও দূষিত সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে উচ্চমাত্রার বর্জ্যের প্রধান উৎস হলো ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম জ্বালানি রড, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের পর দীর্ঘ সময় ধরে তেজস্ক্রিয় থাকে।
এসব ব্যবহৃত জ্বালানি রডে থাকা প্লুটোনিয়াম-২৩৯-এর মতো উপাদানের তেজস্ক্রিয়তা নিরাপদ মাত্রায় পৌঁছাতে প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা পারমাণবিক শক্তি ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অতীতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা পারমাণবিক বর্জ্য মহাকাশে পাঠিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিল। কিন্তু বিপুল ব্যয় এবং উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হলে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
বর্তমানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী দেশগুলোতে ব্যবহৃত জ্বালানি রড প্রথমে বিশেষ পানিভর্তি কুলিং পুলে রাখা হয় অথবা নিরাপদ কনটেইনারে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে সেগুলোকে স্থায়ীভাবে গভীর ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারে স্থানান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
এই ধরনের স্থাপনাকে বলা হয় ‘ডিপ জিওলজিক্যাল রিপোজিটরি’ বা গভীর ভূতাত্ত্বিক সংরক্ষণাগার। সাধারণত ভূপৃষ্ঠের ৪০০ থেকে ৮০০ মিটার নিচে বিস্তৃত টানেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়, যাতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ হাজার হাজার বছর ধরে পরিবেশ ও জীবজগত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে।
বর্তমানে ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ এই ধরনের সংরক্ষণাগার নির্মাণ বা অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। এর মধ্যে ফিনল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে এমন একটি স্থাপনা সম্পূর্ণ নির্মাণ করেছে। দেশটির ‘অনকালো’ নামের ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগার ২০২৬ সালের শেষ দিকে কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনকালো প্রকল্পের প্রযুক্তি উন্নয়ন ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এসকেবি ইন্টারন্যাশনাল।
ইএমএ জানিয়েছে, গবেষণায় সিঙ্গাপুরের জন্য সম্ভাব্য বিভিন্ন গভীর ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ পদ্ধতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিবেচিত কোনো বিকল্পই প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য কোনো পদ্ধতির ক্ষেত্রেই মৌলিক প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়নি। এমনকি উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণও একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো নয়।
একটি ১ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরে প্রায় সাত লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এ ধরনের একটি কেন্দ্র বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার লিটার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপাদন করে, যা একটি অলিম্পিক মানের সুইমিংপুলের প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ জায়গা দখল করতে পারে।
এর মধ্যে মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ উচ্চমাত্রার বর্জ্য, যার প্রধান অংশ ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের সেমাকাউ ল্যান্ডফিলের ধারণক্ষমতা ১১ হাজারেরও বেশি অলিম্পিক মানের সুইমিংপুলের সমান বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ব্যবহৃত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো ক্ষুদ্র মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর)-এর ক্ষেত্রেও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বর্তমানে সিঙ্গাপুর এই উন্নত প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সাধারণত একটি এসএমআরের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা প্রচলিত ১ গিগাওয়াট কেন্দ্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ইএমএ বলছে, উপযুক্ত বিকিরণ সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হলে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গাপুরের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বিস্তৃত গ্রানাইট শিলাস্তর ব্যবহৃত জ্বালানি ও উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য সম্ভাবনাময় বিকল্প হতে পারে।
দেশটির বুকিত তিমাহ গ্রানাইট নামে পরিচিত এই শিলাস্তর উডল্যান্ডস, সেমবাওয়াং, বুকিত বাতক এবং মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। পাশাপাশি পুলাউ উবিন দ্বীপেও গ্রানাইটের উপস্থিতি রয়েছে।
তবে এ ধরনের শিলাস্তরে বড় ধরনের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক ফল্ট থাকা যাবে না। কারণ ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সীমিত ভূমি ব্যবহারের বাস্তবতায় সিঙ্গাপুর ঐতিহ্যগত টানেলভিত্তিক সংরক্ষণাগারের পরিবর্তে গভীর বোরহোল প্রযুক্তির দিকেও নজর দিতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তিতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গভীর সরু গর্ত খনন করে নিচের অংশে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য স্থাপন করা হয়। এরপর বেন্টোনাইট মাটি, সিমেন্ট এবং অ্যাসফল্টের সমন্বয়ে গর্ত স্থায়ীভাবে সিল করে দেওয়া হয়। ফলে পরবর্তীতে বর্জ্য পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে জনগণের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচওয়াই-এর পারমাণবিক কৌশল বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ চিউ বলেন, ফিনল্যান্ডের অনকালো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় চার দশক সময় লেগেছে। শুধু উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই দশক। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও মতবিনিময় বজায় রাখা হয়েছিল।
তার মতে, সিঙ্গাপুরের ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় জনগণকে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। ভূগর্ভস্থ বর্জ্য সংরক্ষণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আলোচনার আগে পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হলে তা আবাসিক এলাকা থেকে দূরে, কম জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল অথবা উপযুক্ত উপকূলীয় দ্বীপে স্থাপন করা হতে পারে।
সিঙ্গাপুর সরকার জানিয়েছে, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিজেদের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে, যাতে দেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।